ঢাকা , রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ , ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুলিশের সংবাদ সম্মেলন

চারজনকে হ'ত্যা'র পর সেই বাসায় গোসল করে খেজুর ও শসা খান খু'নি'রা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-২৩ ১৮:০২:৪০
চারজনকে হ'ত্যা'র পর সেই বাসায় গোসল করে খেজুর ও শসা খান খু'নি'রা চারজনকে হত্যার পর সেই বাসায় গোসল করে খেজুর ও শসা খান খুনিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।


পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে ওই বাড়ির ছাদে গিয়ে দুই ব্যক্তি মাদক সেবন করেন। এরপর একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে তারা আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন। এ সময় তারা গোসল করেন, বাড়িতে থাকা খেজুর ও শসা খান এবং পরে লুট করা স্বর্ণালংকার নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আটক দুজন হলেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। তারা পরস্পরের আত্মীয় এবং একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাশের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ভেতর দিয়ে ওই দুই ব্যক্তি গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গেলে ওই দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়।

পুলিশের দাবি, এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি বাঁচার চেষ্টা করলে শব্দ হয়। সেই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এরপর প্রীতিলতার চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও রশি দিয়ে পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। পরে পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন ঘটনার পর আরও ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ওই বাড়িতে অবস্থান করার কথা স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, দুজনকে একসঙ্গে এবং আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই তাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর ওই দুই ব্যক্তি বাড়ির একটি বাথরুমে গিয়ে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে থাকা খেজুর খান এবং পরে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খান। ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর তারা বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখেন। বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি পুলিশের।

পুলিশ জানিয়েছে, বাড়ি থেকে নেওয়া কিছু স্বর্ণালংকার পরে একটি মন্দিরের পেছনের পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে যায় সন্দেহভাজনরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই স্থান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থলে আগুনে পরীক্ষা করা চুড়ির আলামতও পাওয়া গেছে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে স্বর্ণের বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন বলে তাদের ধারণা হয়।

 

শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি দোতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন।

 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, লাশগুলোতে পচন ধরেছিল এবং পুরো বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সর্বশেষ কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার বোন পূজা চক্রবর্তী। এরপর শনিবার পর্যন্ত তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে স্বজনেরা ওই বাড়িতে এসে মূল দরজা বন্ধ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে একে একে চারটি লাশ উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।

তিনি বলেন, তার ভাই খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা ছিল না। কেন এবং কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেটি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, খবর পেয়ে তিনি মিঠাপুকুরের গ্রামের বাড়ি থেকে রংপুরে এসেছেন। ঘটনার বিস্তারিত তিনি জানেন না এবং প্রকৃত ঘটনা পুলিশ তদন্ত করেই বের করবে বলে তিনি আশা করছেন।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। তারপরও এত বড় হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল, তা অনুসন্ধানে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে মাদক সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি, শসা খাওয়ার আলামতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাওয়া যায়। এসব আলামত এবং তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন দুজনকে শনাক্ত ও আটক করা সম্ভব হয়েছে।



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ